সে অনেককাল আগের কথা যখন এখানে এসেছিলাম। জায়গাটি নাকি সকালের সৌন্দর্যের জন্য বিখ্যাত। কোন ধারণা নেই!একেতো দিনের সবচেয়ে বাজে সময় আমার কাছে সকাল, আর সুন্দরের পূজারী-সেটা আজও হয়ে উঠতে পারিনি।
যাইহোক, তবুও মাঝে মাঝে কিছু অপগন্ডের পাল্লায় পড়ে প্রায়ই সকালের মারপ্যাঁচে পড়ে যাই। নাহ! এ সকালে হাওয়াই মিঠাই রোদ নেই, শেফালীর মতো টপটপ শিশির ঝরেনা, হাওয়াদের গুনগুন নেই, পাখিদের পাঠশালা বসেনা। আর যা আছে তা খেয়াল করার মেজাজ থাকেনা। কারণ হয়তো হিসাব কষতে থাকি এখান থেকে আর কত পা হাঁটলে আস্তানাটি কত পা সামনে এগোবে।আর নয়তো বিশাল দার্শনিক বুলি আওড়াতে থাকি-কী লাভ এসবে!সবই ফাঁকি!
বসন্ত এবার ছুটি নেবে, গ্রীষ্ম পথে আছে। দেয়াল, ঝোঁপ, গেট, লোহার বেড়ায়-লালের মিছিল। অগুনতি লাল গোলাপ। গন্ধবিহীন গোলাপ বিমর্ষতা বাড়ায়। মরা ডালে, পাথরের ফাঁকে, শুকনো মাটির বুকে ফুলেদের জলসা। রংধনু ফুলেদের হাসিতে বর্ণ আছে, গন্ধ নেই। আকাশে নীল নেই, সাদা মেঘের ভেলা ভাসেনা কখনো। ‘অনন্ত নক্ষত্রবিথী’ দেখতে কেমন -তা কোনদিন জানা যাবেনা। পূর্ণিমায় জোছনা বান ডাকেনা, অমাবস্যায় আঁধার নামেনা। বৃষ্টিতে নেই নুপুরের নিক্কন, বজ্র এখানে ক্ষীণ, কৃশকায়।
পথের মাঝে পথ হারিয়েছি। হারানো পথে কেউ দেখে না কোন পথে যায় একলা পথিক। আঁটোসাঁটো জিন্স, গায়ে গোলাপী জামা, হাতে লেডিস ব্যাগ, ঠোঁটে লিপগ্লস, মুখে আরো ফটফটে ফর্সা দেখানোর বিবি ক্রীম, ছোট-বড়, বাঁকাচোরা চুল, কানে হেডফোন, চোখে শূন্য দৃষ্টি নিয়ে পাশকেটে হুহু করে বের হয়ে যায় যুবকেরা। যুবতীরা মুখ ডুবিয়ে রাখে সেলফোনের আয়নাতে। ঐ দুচোখের উপরের পর্দা আর কতবার কাটতে হবে, মুখের কোনপাশটা থেকে আরও কিছু মাংস কাটা যায়, সামনের কাটা চুলগুলোকে আর কতটুকু কাটলে মুখটা আরও ছোট লাগবে-পাঁচ পরতের মেকআপে গভীর চিন্তার দাগ। সময় কোথা হে, পাশ ফিরে চাই!
ভুলের মাঝেও ভুল হয়ে যায়। রাস্তায় বা বাসে ছোট ছোট কোকড়ানো চুলের মধ্যবয়সী নারীকে হঠাৎ বড় আপন মনে হয়। ভারী কাঁধব্যাগ টেনে নেয় কোন সহৃদয় শুষ্ক কঠিন হাত। বিদায়বেলায় ইয়োগার্ট বা চকোলেটের সাথে থাকে অস্পষ্ট স্নেহ।
প্রায়ই মনে হয় জমীর আলীর নানী’র সাথে কিম ইয়ুনের দাদীর আসলে কোন পার্থক্য নেই। জমাট ঠান্ডায় মাঝরাত্তিরে বাঁকা পিঠে বেছে বেছে ময়লা সাজায় তাঁরা। প্লাস্টিক একপাশে, কাগজ একপাশে, এরকম আরও নানা কিছু। প্রতিবার ভাবি, নাহ এবার থেকে ময়লা ঠিক করে ফেলব। কিচ্ছু করা হয়না, যেমন হয়ে উঠে না বলাটা-‘তুমি সরো, তোমার এই ভারী গাড়িটা আমি ঠেলে দিই।’ আশি বছরের হারাবুজি (দাদা/নানা) তাঁর মতোই পুরানো একটা সাইকেল টেনে নিয়ে যায় বা অটোবাইক। শ্লথ গতিতে, উঁচু-নিচু রাস্তা পার হয়ে। পিছনে কখনো থাকে হাটে বেচার মালপত্র অথবা হালমনি (দাদী/নানি)। সাইকেলে আমার হাতগুলো তখন কেমন ঝুলতে থাকে, প্যাডেলে পা লাগেনা আর আগের মত শক্তিতে।
লোকে মন্দ বলবে, তাতে কী! ফ্রি বিনোদন জুটিয়ে দেয় বেদাল (খাবার গাড়ি, ফোন করে দিলে খাবার দশ/পনের মিনিটের মধ্যে চলে আসে)! আমার ধারণা, এদেঁর সত্যিকার রেসিং এ নামালে পেশাদাররা হেরে যাবে। অসম্ভব দ্রুতগতিতে বাইকে নিয়ে ধেয়ে যায়! সাথে থাকে চালানোর নানান কসরত। একবার ডানে হেলে পড়ে তো আর একবার বামে। শুয়ে -বসে, দুই পা ছেড়ে দিয়ে, কান এবং ঘাড়ের সংযোগ স্থলে সেলফোনটি রেখে। আসল বিনোদনটা পাই যখন দেখি একটু পর ফটাস শব্দে নায়ক ধরণীতল! দ্রুতগতি নিয়ন্ত্রণ করতে পারেনি কাউকে পাশ কাটাতে গিয়ে অথবা কিছুর সাথে সংঘর্ষ। একবার একজনকে গিয়ে জিজ্ঞেস করলাম-‘তুমি ঠিক আছো তো?’, কাতরাতে কাতরাতে বলছে -‘খ্যানছানায়ো’ (ঠিক আছি)! মানে মানে কেটে পড়ি। দূর্ঘটনায় আক্রান্ত ব্যাক্তিকে পুলিশ না আসা পর্যন্ত স্পর্শ করা বারণ!
আমি মজা দেখার দলের লোক। সবচেয়ে মজা পাই শুক্রবার রাতে। সপ্তাহের পাঁচদিনে কী কী বার থাকে মাঝে মাঝে ভুলে দেয় এই সব কাজের কাজী, ‘পাল্লি পাল্লি’(তাড়াতাড়ি)র দেশ। শনি-রবি যেহেতু বন্ধ তাই সবার কাছেই শুক্রবার হচ্ছে ‘চাঁন রাইত’। আর জীবনে আছে কী, ঢালো গলায় ‘সজু’ (স্থানীয় এলকোহল) যত পারো! এমনও দেখেছি সন্ধ্যা সাতটা থেকে শুরু করে রাত দুইটা/ তিনটা পর্যন্ত চলে। আমি ১০০% নিশ্চিত এরা স্বর্গীয় পানীয় পাশে সরিয়ে রেখে ঈশ্বরকে বলবে ‘ একটু সজু পাওয়া গেলে মন্দ হতো না’। মজা শুরু হয় এর পরেই। ভদ্র পোশাকে চার হাতপায়ে কেউ হেলিয়ে আছে কোন বদ্ধ দোকানের দরজায়। ছেলেবন্ধুর কাঁধে কেউ বেহঁশ, বহনকারী নিজেও খুব একটা হুঁশে নেই। মেয়ে বান্ধবী টেনে নিয়ে যাচ্ছে কোন ভারী শরীর যে নিজেই হাই হিলের গুঁতো খেয়ে এপাশ ওপাশ কাত হয়ে পড়ছে। আজুসি (বিবাহিত অথবা সাধারণত ত্রিশোর্ধ পুরুষ) এলোমেলো পায়ে, টকটকে গাল নিয়ে মাঝে মাঝে শক্তি পরীক্ষায় ব্যাস্ত হয়ে পড়ে। কারও হয়ত জীবনের সব কষ্ট এদিন সব একসাথে মনে পড়ে যায়। সব ভুলে বসে যায় রাস্তায় পানির ফোয়ারা ছুটিয়ে। পাশের মেয়েটি অসহায় মুখে দাঁড়িয়ে থাকে! বন্ধুরা পড়ে যায় বিপদে!
(নাহ আজ আর লিখতে ইচ্ছা করছে না!)
🙂