রান্না এবং বিবিধ

মাস কয়েক আগে কোন এক পার্টিতে বেশি চেনা-অল্প চেনা-অচেনা মুখগুলো ঘুরে ফিরে দেখছিলাম। হঠাৎ করে রসুইঘর থেকে সাজানো খাবার হাতে ছুটে আসা একজনের মুখোমুখি হতে হলো। প্রস্তুত হচ্ছিলাম “কেমন আছেন”, “অনেকদিন পর” এইসবের প্রতিউত্তর নিয়ে। কিন্তু এই প্রশ্ন এবং মন্তব্যের জন্য মোটেও প্রস্তুত ছিলাম না-“রান্না করতে পারেন?” (কোন উত্তরের আশায় না থেকেই) “আপনাকে দেখলে মনে হয়না, আপনি পারেন।”

অসংখ্য বার শুনেছি-
–রান্না করো/করেন?
-রান্না করতে পারো/পারেন?
-একদিন রান্না করে খাওয়াও/খাওয়ান? দেখি, কেমন পারো?পারেন
-কে রান্না করে বেশিরভাগ সময়? (সৌভাগ্য নাকি দূর্ভাগ্য, কোনটি বললে এখানে বেশি যুক্তিযুক্ত হবে বুঝতে পারছি না। যাইহোক, আমার দৈনন্দিন সঙ্গী রান্না করতে পারেন,কাজটি ভালোওবাসেন।)
–কার রান্না বেশি মজা হয়?
-কতদিন রান্না করো? ( আমার দৈনন্দিন সঙ্গীর কাছ থেকে। যখনই তাকে মহৎ যজ্ঞ (রান্না) শেষে সবকিছু পরিষ্কার করতে বলা হয়, কারণ ওটাও রান্নার অংশ বলেই আমি জানি। কিংবা গৃহস্থালী পরিষ্কারে অংশগ্রহনের কথা বলা হয়।)

বিশেষ পরিস্থিতির চাপে, রান্না এবং গৃহস্থালী কর্মে যখন আমার হাতেখড়ি হয়, শরীর এবং মন উভয়ই তার অনুপোযোগী ছিল। ক্রমেই সাংসারিক কর্মে “দক্ষতা”, “ত্যাগ” এবং “মহানুভবতার” কথা দিকে দিকে ছড়িয়ে পড়েছিল। হাতের চেয়েও বড় বটিতে মিহি করে পেঁয়াজ কাটার চেষ্টা কিংবা শরীরের অর্ধেক সমান ডেকচি থেকে মাড় গলানোর দৃশ্য হয়ে উঠেছিল দৈনন্দিন বিনোদনের বিষয় এবং নিতান্তই স্বাভাবিক। মাঝে মাঝে মন কোন কিছুই বুঝতে চাইতো না। রান্নাবাটি ফেলে দে ছুট! তখনই শুনতে পেতাম, আমার মত “অবুঝ” আর “নিষ্ঠুর” জগৎ সংসারে দু’টো মেলা ভার! মনে আছে, যখনই আমার হেঁসেলের ভার নিতে হতো, পিতৃদেব কোন এক মনোবেদনায় ভুগতেন আর ভাতৃদেব বলেছিলেন-“এ কিছুতেই স্বাভাবিক নয়”। ভাগ্যিস, লঙ্কাপুরীতে রক্ষাকারী হিসেবে এ দু’জন ছিলেন!

 

জীবনের দ্বিতীয় পর্বে খাদ্য হয়ে উঠেছিল শুধুই শারীরিকভাবে বেঁচে থাকার উৎস। এই বিষয়টিকে এ ছাড়া অন্যকোনভাবে রূপ দেয়া ছিল সম্পুর্ণভাবে আর্থিক সামর্থ্যের বাইরে। খাওয়ার মোটামুটি উপযোগী খাবার একবেলা বাইরে খেলে খরচ হতো ১০ টাকা। আর ৫ টাকার বাজারে রান্না করলে খাওয়া যেত দু’বেলা। তাই “রান্না” টি ছিল নিতান্তই শারিরীকভাবে বেঁচে থাকার তাগিদ। সবচেয়ে সস্তা এবং বিরক্তিকর খাবারকে কীভাবে অতি সহজে সুস্বাদু করে তোলা যায়, তার কৌশল বলে দিয়েছিলেন ভাতৃসম একজন সিনিয়র। সে সময়গুলোতে চাইলেই রেসিপির জন্য গুগুল, ইউটিউব বা জননীর দ্বারস্থ হওয়ার উপায় ছিলনা। ইচ্ছে না থাকলেও নিজের উপরই নির্ভর করতে হতো স্বাদের নতুনত্ব এবং ভিন্নতার জন্য।

“রান্না” বিষয়ক এই অভিজ্ঞতাগুলো থাকার ফলেও যখন উপরের তালিকাভুক্ত প্রশ্নের যেকোনটির একটিরও উত্তর দিতে যখন আমাকে বাধ্য করা হয়, তা যেমন বিরক্তিকর, ঠিক তেমনই আমার কাছ কুরুচিপূর্ণ বলে ঠেকে।

কিছু জিনিস আমার কিছুতেই বোধগম্য নয়।

রান্না করতে পারা বা না পারা কীভাবে একটি বিশেষ যোগ্যতার মাপকাঠি হয়ে, তা বিশেষ লিঙ্গ নির্ধারণ সহ সেই লিঙ্গের ভূমিকা কী হবে কিংবা ক্ষেত্র বিশেষে ব্যাক্তির ভূমিকা কী হবে, তা নির্ধারণ করতে পারে। একই দক্ষতা কীভাবে একটি লিঙ্গ বিশেষের জন্য এতই স্বাভাবিক যা দৈনন্দিন জীবনে আমাদের গোচরেও আসে না। আরেকটি লিঙ্গের জন্য হয়ে দাঁড়ায় তা বিশেষ দক্ষতা এবং প্রশংসাযোগ্য।

ব্যক্তি বিশেষের শারিরীক অবয়বের সাথে এই “দক্ষতার” (রান্নার) কি সম্পর্ক থাকতে পারে বা থাকলেও সেটি কেমন?

আমার বর্তমান শারীরিক অবয়ব তথাকথিত এই সমাজের বেশিরভাগ সদস্যদের ওয়াকিবহাল করার “অনুপোযোগী” যে, এই শারীরিক অবয়ব ধারণকৃত ব্যক্তির “রান্না” নামক বিশেষ “দক্ষতার” সাথে তাঁর আদৌ কোন সম্পর্ক রয়েছে।

এক বন্ধু তাঁর দুপুরের খাবার খাচ্ছিল। অনুরোধে সেই খাবারে আমিও ভাগ বসালাম। চেখে দেখে মনে হলো, এই খাবারের পদটিকে চাইলে আরও স্বাদ বাড়ানো যেতে পারে। বললাম তাঁকে, “তুমি এই-এই ব্যবহার করেছ, তাই না? পরবর্তীতে এটা রান্না করার সময়, এই -এই ছাড়া, এই- এই ব্যবহার করো।” আমার বন্ধুটি হো হো করে হেসে উত্তর ছিল-“দেখো, তুমি আমাকে রেসিপি দিচ্ছ!” আমি ঠিক তখনই বুঝতে পারিনি কেন আমার রেসিপি দেওয়ার বিষয়টি তাঁর কাছে এতোটা কৌতুকের বিষয়!

আমার একই বন্ধু তাঁর কয়েকজন বন্ধুকে নিয়ে একসাথে রাতের খাবার খাওয়ার আয়োজন করেছে। অনুরোধ করেছে, আমরা প্রত্যেকে যেন এক একটি পদ নিয়ে যাই। আমার দৈনন্দিন সঙ্গী বানিয়েছিল তাঁর নিজের রেসিপিতে তৈরি একটি পদ। আমার বন্ধু গল্পের ফাঁকে হাসতে হাসতে আমাকে জিজ্ঞেস করলো, “তুমি কি একটি জিনিস খেয়াল করেছ, আমি কিন্তু তোমার অমুক পদটি তোমাকে আনতে বলিনি, তোমার সঙ্গীকে তাঁর এই বিশেষ পদটি আনতে বলেছি?” নাহ, সে বলার আগে আমি খেয়াল করিনি!

নাহ, অপ্রস্তত পরিস্থিতির এখানেই শেষ নয়!

কোন এক বিশেষদিন উপলক্ষে আমাদের এক পারিবারিক বন্ধু আমার সঙ্গীকে অনুরোধ করেছিল, সেই বিশেষদিনের যজ্ঞটির পুরোহিত হতে। কোন এক কারণে দিনটি আমাদের জন্য শুভ ছিলো না কোন এক অনাকঙ্খিত উদ্ভূত সংকটের কারণে। আমার সঙ্গী খুবই মুষড়ে পড়েছিল। আমার ঠিক অতোটা সঙ্গীন অবস্থা না হলেও, তথৈবচ। যেহেতু কথা দেয়া হয়েছে তাই হেঁসেলের ভার নিলাম। সারাদিন একবার সেই সংকট নিরসনের চেষ্টা করি, তো আরেকবার ২০/৩০ জন লোকের জন্য মাংস কষাই। সেদিনের পর অনেকসময় কেটে গেছে। আজও আমাকে আমার সঙ্গী কিংবা সেই পারিবারিক বন্ধুটি, কেউ বলেনি “ধন্যবাদ”।

দ্বিতীয় ঘটনাটিও অনেকটাই প্রথমটির পুনরাবৃত্তি। শুধু পার্থক্য এইটুকুই, এবারের পারিবারিক বন্ধুটি অনেকদিনপর কোন এক আড্ডায় হো হো করে হেসে “নিছক কৌতুকে” সবার কাছে আমার নতুনভাবে আমার পরিচিতি দিয়েছে এইভাবে-“উনার রান্না করতে উপলক্ষ্য লাগে”। হুম, ধন্যবাদ শব্দটি যথারীতি উহ্যই ছিল।

বিষয়টি অবাক করার মতোই যে, একই কাজ পাত্র ভেদে কীভাবে দু’ধরণের রূপ নিতে পারে। আবার পাত্র ভেদে সেই কাজের গুরুত্বের মাপকাঠিও নির্ধারণ হয়। আমার সঙ্গী (পুংলিঙ্গ, যুক্তিসঙ্গত কারণেই উল্লেখ করতে হলো) করা “রান্না” একটি কাজ। এবং তা প্রশংসার দাবীদার। আবার একই জিনিস আমার (স্ত্রী লিংগ) ক্ষেত্রে শুধুমাত্র দৈনন্দিন গৃহস্থালী কাজের অংশবিশেষ। এবং এখানে ধন্যবাদ দেয়াটাই বাহুল্যতা। এটা খুব ভালো করে টের পাওয়া যায় যখন আমার সঙ্গীকে বলা পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা নামক কাজের কথাটি স্মরণ করিয়ে দেয়া হয়। চোখ পাকিয়ে, গলার শিরা ফুলিয়ে তখন তাঁর একটাই প্রশ্ন “তুমি কতদিন রান্না করো হিসেব করে দেখেছ?” হয়তো পাল্টা উত্তর হিসেবে, সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে তাঁর দেয়া তাৎক্ষণিক সুস্বাদু এবং মজার রান্নার ছবির পাশে রান্নাঘরের ভয়াবহ চিত্রটির ছবি দিয়ে দিতে পারি। এবং তা পরিষ্কার করার পর ঘন্টার হিসেবটি দিয়ে দিতে পারি। কিংবা নতুন দেয়া কোন গাছের ছবির পাশে চারপাশে মাটি ছড়িয়ে নোংরা ওয়ারড্রোব, কার্পেটের ছবি এবং কীভাবে, কতক্ষণে পরিষ্কার করা যায়, তাঁর একটি ছোট্ট বর্ণানাও সংযুক্ত করে দিতে পারি।

নাহ, আমার সঙ্গী, একটি গৃহস্থালীর দৈনন্দিন কাজের পরিবেশনায় ব্যক্তিগত সম্পর্ক নামক সিনেমার কোন “ভিলেন” নয়। তিনি অত্যন্ত সহজ-সরল ব্যক্তি মানুষ। রান্না করতে ভালোবাসেন। নিজের সৃজনশীলতায় চমৎকার সব রান্না করেন। এই বিষয়ে তাঁর প্রতিভায়- তিনি নিজে, তাঁর চারপাশের বন্ধুরা এবং মনে হয় আমি নিজেও মুগ্ধ! তাঁর মজার সব রান্নার উচ্ছসিত প্রশংসার মাধ্যমে তাঁর মন জয় করে নেয়া যেমন সহজ, ঠিক তেমনি খুঁত ধরলে তাঁর কোপানলে পড়ে যাওয়ার সম্ভাবনাও তেমনি সহজ। কিন্তু, মাঝে মাঝে তিনি সমাজ এবং তার পরিবেশ দ্বারা উৎপাদিত “পুরুষ”।

সমাজের উৎপাদিত উৎপাদন “পুরুষ” এবং “নারী” এই দুই বাইনারি অবস্থান ছুঁড়ে ফেলতে চাইলেই যেন ছুঁড়ে ফেলা যায় না। সমাজের বাকী সদ্যসরা ঠিকই সেই তকমাগুলো কুঁড়িয়ে এনে আবার গায়ে সেঁটে দিয়ে যাবে এবং সাথে মনে করিয়ে দিয়ে যেতে ভুলবেনা কার কেমন ভূমিকা হওয়া উচিৎ। আজকে সকাল থেকেই একটি কথা মাথায় ঘুরপাক খাচ্ছে – দ্য ওয়ার্ল্ড ইজ ফুল অফ শেমলেস স্টুপিড! এই “শেমলেস স্টুপিড” দের একটি মনস্তাত্ত্বিক অনুসন্ধান করার চেষ্টা করছি। একটি চমৎকার জিনিস খেয়াল করলাম (অন্তত আমার নিজের কাছে চমৎকারই মনে হয়েছে), মানুষকে সবচেয়ে বেশি ভালো বোঝা যায় যখন সে অন্যের বিষয়ে কথা বলা শুরু করে। অন্যের বিষয়ে করা তার সমস্ত কথাগুলো একটু খেয়াল করে শুনলেই বোঝা যায় আসলে সে প্রকারন্তরে নিজের কথাই বলছে। অন্যের গল্পের ছলে তার ব্যক্তি চরিত্রটি আস্তে আস্তে ফুটে উঠে। দূর্ভাগ্যবশত (কিংবা কে জানে আমার জন্য হয়তো সৌভাগ্যই বটে) আমার চারপাশের এই ব্যক্তি চরিত্রগুলো অন্ধকার কিংবা ছায়া ছায়া মানব। এরা বেশিরভাগই কোন না কোন কমপ্লেক্সের মধ্যে বড় হয়েছে এবং এখনও আছে। সেই কমপ্লেক্স অনেকাংশেই ইনফেরিওরিটি কমপ্লেক্স। শৈশবের বেড়ে উঠা সুস্থ পরিবেশে হয়নি। মা-বাবা-কিংবা ভাইবোন এর দ্বারা এবিউস হয়েছে। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে বুলিং এর শিকার, হয় নিজে করেছে কিংবা হয়েছে। হয়তবা সবকিছুর চাপে পড়ে নিজের বায়োলজিক্যাল জেন্ডার নিয়েও সন্দিহান বা কোনদিন প্রকাশই করতে পারেনি। যৌনতার শিক্ষার প্রথম এবং এক মাত্র পাঠ পর্ণোগ্রাফি। কারও কারও ক্ষেত্রে কাবিননামায় স্বাক্ষরের পর স্ত্রী/স্বামীই জীবনের একমাত্র রোমান্টিক পার্টনার। সম্পর্ক শব্দটি শুধু মাত্রই শারিরীক। নিজের ব্যক্তিগত জীবনে সুখী নয়-পার্টনার, সেক্স এবং রিলেশন, যেকোন একটি (বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই সেটি-সেক্স )। বিষন্নতা একটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে, সেই সাথে হতাশা এবং বিষাদ তো আছেই।

কাজেই, যখন এ ধরণের প্রশ্ন শুনি-“কে বেশি রান্না করে? কার রান্না বেশি মজা?আপনি কী করেন?” ইত্যাদি, স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্নকারী বা মন্তব্যকারী তার কথা বলছে। আমি যদি তার কথাগুলো অনুবাদ করি তাহলে দাঁড়ায়-“আমি একজন স্টুপিড। ভদ্রতা কী জিনিস সেটা আমি জানিনা কিংবা শিখিনি।” এই সাথে তার বেড়ে উঠার পরিবেশের কথাও বলে দেয়। যদি কোন বিবাহিত দম্পতি হয়, তাহলে সহজেই বোঝা যায় এই জিনিসগুলো সে তার সঙ্গীর কাছ থেকে পায়না। এবং স্বাভাবিকভাবেই ঈর্ষান্বিত। আবার কেউ কেউ আছেন এই গোত্রের বাইরে। এরা সংকীর্ণমনা এবং গোঁড়া। এদের ব্যাখ্যার ক্ষমতার বাইরে যা আছে তা সবই ত্রুটিপূর্ণ।

আমি গল্প ভালোবাসি। আমি বিশ্বাস করি প্রতিটি মানুষ এক একটি গল্প। তাই কেউ যখন আমার গোলাপী রঙের পায়জামা নিয়ে অযাচিত মন্তব্য করে, আমি শুধু কান পেতে দিই। এই তো গল্পের শুরু!

 

 

 

One thought on “রান্না এবং বিবিধ”

  1. সাধারনত সপ্তাহে ষাট বা তারও বেশি ঘণ্টা কাজ করি মানে হুকুমের গোলাম । হুকুমের গোলাম মানে আমার মালিক আমাকে শারীরিক ও মানসিক উভয়ত নিংড়ে তবে মজুরি দেন । কাজের দিনগুলোতে খুব ভোরে ঘুম থেকে উঠি এবং বাসায় ফিরি রাত ৮/৯ টার পরে । আমার স্ত্রী সঙ্গী চাকুরী করেন না । তিনি পরিবারের যাবতীয় কাজ ও সন্তান লালন পালন করেন । অফিস থেকে ফিরে বা অফিসে যাবার আগে আমিও যথা সম্ভব পরিবারের কাজ যেমন বাজার করা , কাপড় ধোয়া, ঘর ও আসবাব পরিস্কার করা , রান্না করা , বাসন মাজা ইত্যাকার কাজগুলোও করি । তো এর ফাঁকে যখন আমি আমার পছন্দের কোন কাজ যেমন- বই পড়া , গান শোনা , লেখা , সিনেমা দেখা বা বন্ধুদের সাথে আড্ডা দেয়া ইত্যাদি তখন আমার স্ত্রী সঙ্গীটি আমাকে কোন কাজের কথা বললে আমি বিরক্ত হই এবং গলার রগ ফুলিয়ে বলি – আমার কাজের সময় আমাকে একদম জ্বালাবে না । আর যায় কোথায় , স্ত্রি সঙ্গীটি মওকা পেয়ে বলা শুরু করেন যে – তার একার পক্ষে সন্তান সামলানো ,সংসারের যাবতীয় কাজ করা ……… তুমি বুঝবে কি করে । এই তো শুরু হয়ে গেল দুজনের সংসার সম্পর্কের যাবতীয় হিশেব নিকাশ । এবং সেই হিশেব নিকাশের নীট ফল বলতে গেলেই দুজনের অর্থাৎ সমাজ সংসারে নারী ও পুরুষের স্বতন্ত্র জীবন গল্প তৈরি হবে ।

    সমাজ সংসারে নারী পুরুষের সম্পর্ক সমাজের শ্রমবিভাগ নিরপেক্ষ নয় মোটেই । আর এই শ্রমবিভাগ থেকে উদ্ভূত নারী পুরুষের সম্পর্কের পারস্পারিক দৃষ্টিভঙ্গিও তাই বিভক্ত । শ্রমবিভাগ সৃষ্টির দায় ও শ্রমবিভাগগত সুবিধা অসুবিধার শিকার প্রকৃতপক্ষে নারী ও পুরুষ উভয়ই । শ্রমবিভাগে অভ্যস্ত নারী ও পুরুষ যখন আর বিভাগটা মানতে চান না, নতুন কোন প্রবর্তনায় প্রবেশ করেন তখন তার হর্ষ বিষাদ দুটোই আছে এবং তা এড়ানো যায় না বৈকি ।
    আজকের নারী যদি মনে করে তার প্রতি পুরুষের দৃষ্টি ভঙ্গি মানবিক নয় তাহলে নারীকে অবশ্যই তার জন্য লড়তে হবে । আজকের পুরুষ যদি মনে করে সেও নারীর কাছে কোনঠাসা তাহলে তার জন্য লড়তে হবে । তবে এই লড়াই যদি প্রজাতিগত ভাবে নারীর বিরুদ্ধে পুরুষ আর পুরুষের বিরুদ্ধে নারীর লড়াই হয় তাহলে উভয়েরই পরাজয় অনিবার্য ।
    বরং আমাদের লড়াইটা হওয়া দরকার যে বাবস্থাতন্ত্র এই বিভেদ আর অধস্তনতার দৃষ্টিভঙ্গি ও বাস্তবতা উৎপাদন করে তার বিরুদ্ধে । তথাকথিত নারীবাদ বা পুরুষতান্ত্রিকতা এই সমস্যার সমাধান দিতে পারবে না ।

    নারী পুরুষের সম্পর্কের ক্ষেত্রে ‘কাজ ‘ সে রান্না হউক আর মেশিন চালানো হউক, বাসন মাজা হউক আর গল্প লেখা হউক ‘কাজের’ কোন পুং স্ত্রী বা হিজড়া লিঙ্গ নাই । আছে নাকি ?
    নারী পুরুষের সম্পর্কের ক্ষেত্রে ‘ অধিকার ‘ সে সম্পদে আর সম্মানে হউক , মূল্যবোধ আর আইনে হউক অধিকারের কোন পুং স্ত্রী বা হিজড়া লিঙ্গ নাই । আছে নাকি ?

    কোন এক চিত্রকর হিন্দু মিথের দেবাদিদেব শিব ও তার স্ত্রী দেবী পার্বতীর একখানা ছবি এঁকেছিলেন । ছবিখানার নাম হোল হর পার্বতী অর্থাৎ শিবের শরীরের অর্ধাংশ ও পার্বতীর শরীরের অর্ধাংশ একত্রে মিলিয়ে এক সম্পূর্ণ শারীরিক অবয়ব । হিন্দু ধর্মাবলম্বী নরনারীগণ আজো সেই চিত্রখানাকে ভক্তিভরে পূজা করেন ।
    চিত্রকর চেয়েছিলেন একই সত্তার ভিন্ন দুটি প্রকাশ দেখাতে কিন্তু হায় ছবিটিতে ভিন্ন দুটি সত্তার মিলিত করনের প্রচেষ্টাই দৃশ্যমান হয় ।
    প্রজাতি বৈশিষ্ট্যর প্রেক্ষিত থেকে নারী তার নারীত্বই সুমহান , পুরুষ তার পৌরুষেই সমুজ্জ্বল ।

    সহবাসে এমন পিঠ ফিরিয়ে থাকা প্রহর আমরা চাই নি । চেয়েছিলাম কি ?

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *